খেলা

নিলামের ফাঁকে জেনে নিন ডি–থ্রি কী এবং কেন

আবহটা ঠিক বিপিএলের নিলাম বা প্লেয়ার্স ড্রাফটের মতো জমজমাট নয়। তবে আগ্রহের জায়গাটা ঠিকই আছে। কোন দল কোন খেলোয়াড়কে কত পয়েন্টে নিচ্ছে, কার চাহিদা বেশি উঠছে, কারা ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠছে দল হিসেবে, কারাইবা জাতীয় দলের খেলোয়াড় বেশি টেনে ফেলছে!

ঢাকার একটি তারকা হোটেলে চলছে নতুন কাঠামোর ঘরোয়া ক্রিকেট ডোমেস্টিক থ্রি বা ডি–থ্রির খেলোয়াড় নিলাম। পাঁচটি শ্রেণির ২৭৫ জন ক্রিকেটারের মধ্যে থেকে টুর্নামেন্টের ছয় দল বেছে নিচ্ছে তাদের খেলোয়াড়। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২ কোটি ৩০ লাখ পয়েন্টে জাতীয় দলের পেসার শরীফুল ইসলামকে কিনে নিয়েছে সিটিজেন ব্যাংক। জাতীয় দলের আরেক পেসার তাসকিনকে ওয়ালটন গ্রুপ কিনেছে ২ কোটি ১০ লাখ পয়েন্টে। আর জাতীয় দলের ওপেনার তানজিদ তামিমকে তৃতীয় সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকায় নিয়েছে ফরচুন গ্রুপ। এখন পর্যন্ত প্রথম ধাপের নিলাম শেষ হয়েছে। বিরতি দিয়ে নিলাম চলবে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। নিলাম পরিচালনা করছেন ভারতের বিখ্যাত সঞ্চালক ও ধারাভাষ্যকার চারু শর্মা

নিলাম চলছে চলুক, এর মধ্যে আরেকবার জেনে নেওয়া যাক তিন সংস্করণ মিলিয়ে নতুন কাঠামোর ঘরোয়া ক্রিকেট ডি–থ্রি’র বিস্তারিত।

ডি–থ্রি কী ও কেন

টি-টুয়েন্টি, ৫০ ওভারের ক্রিকেট ও চার দিনের ম্যাচ—তিন সংস্করণের প্রতিযোগিতাকে একই কাঠামোর আওতায় এনে ‘ডোমেস্টিক থ্রি’ বা ‘ডি-থ্রি’ ট্রফি চালু করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।

ঘরোয়া ক্রিকেটের আকর্ষণ বাড়ানো, ক্রিকেটারদের খেলার সুযোগ বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগিতাটিকে আরও পেশাদার করে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নতুন এই প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল জানান, ঘরোয়া ক্রিকেটের হারানো আকর্ষণ ফিরিয়ে আনতে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতেই এই উদ্যোগ। বোর্ডের কাছে ঘরোয়া ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া ছিল উদ্বেগের বিষয়। নতুন কাঠামোর মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি বদলাতে চায় বিসিবি।

ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট বিপিএল এবার হচ্ছে না। নানা বিতর্কে জর্জরিত টুর্নামেন্টটিকে ভবিষ্যতে আরও গুছিয়ে করতে চায় বিসিবি। বিসিবির আশা, বিপিএল না হলেও নতুন কাঠামোর ডি–থ্রি খেলোয়াড়দের আর্থিক ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দিবে।

নিলাম অনুষ্ঠানে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালপ্রথম আলো

তিন প্রতিযোগিতা, এক কাঠামো

ডি-থ্রি ট্রফির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, আগে আলাদাভাবে আয়োজিত তিনটি প্রতিযোগিতা এখন একই কাঠামোর অধীনে আসছে। ন্যাশনাল ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) টি-টুয়েন্টি সংস্করণ এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের (বিসিএল) চার দিনের ও এক দিনের ম্যাচের প্রতিযোগিতা এই নতুন কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। তবে এনসিএলের নিয়মিত চার দিনের প্রতিযোগিতা আগের মতো আলাদা থাকবে।

বিসিবির ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, তিন সংস্করণে মোট ৪২টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর মধ্যে টি-টুয়েন্টিতে ১৯টি, এক দিনের ক্রিকেটে ১৬টি এবং চার দিনের ক্রিকেটে সাতটি ম্যাচ রয়েছে।

এই কাঠামোতে একই দলকে সংক্ষিপ্ত সংস্করণের ক্রিকেটের পাশাপাশি দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটেও নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করতে হবে। টি-টুয়েন্টিতে দ্রুত রান তোলা ও চাপ সামলানোর দক্ষতার সঙ্গে চার দিনের ক্রিকেটে ধৈর্য, কৌশল এবং ধারাবাহিকতারও পরীক্ষা হবে।

অংশ নিচ্ছে ছয় করপোরেট দল

প্রথম তিন মৌসুমের জন্য ছয়টি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দল পরিচালনার চুক্তি করেছে বিসিবি। দলগুলো হলো ব্লুস্টার, ওয়ালটন গ্রুপ, সিটিজেন ব্যাংক, একমি গ্রুপ, সেভেন রিংস সিমেন্ট ও ফরচুন গ্রপ।

ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘরোয়া ক্রিকেটে করপোরেট বিনিয়োগ এবং দল পরিচালনায় পেশাদারত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছে বোর্ড। স্পনসরশিপ ও টিকিট বিক্রি থেকে আয়ের ৫০ শতাংশ দলগুলোর সঙ্গে ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

নিলামে অংশ নিয়েছে ৬ কর্পোরেট দলপ্রথম আলো

ছয় দলের ছয় আইকন ক্রিকেটার

আজ নিলাম হলেও প্রতিটি দল আগেই একজন করে আইকন ক্রিকেটার বেছে নিয়েছে। ওয়ালটন গ্রুপ নিয়েছে মেহেদী হাসান মিরাজকে, ফরচুন গ্রুপ তাওহিদ হৃদয়কে, একমি গ্রুপ মোসাদ্দেক হোসেনকে, সেভেন রিংস সিমেন্ট মুশফিকুর রহিমকে, ব্লুস্টার নুরুল হাসানকে ও সিটিজেনস ব্যাংক মোহাম্মদ নাঈমকে। জাতীয় দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পাশাপাশি ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত এবং তরুণ ক্রিকেটারদের একই প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ তৈরি করাও এই কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

অর্থের বদলে পয়েন্টে খেলোয়াড় নিলাম

ডি-থ্রি ট্রফির দল গঠনে প্রচলিত অর্থভিত্তিক নিলামের পরিবর্তে হচ্ছে পয়েন্টভিত্তিক নিলাম। প্রতিটি দলের জন্য ১০ কোটি পয়েন্ট বরাদ্দ আছে। সেই সীমার মধ্যে থেকেই দলগুলোকে খেলোয়াড় বেছে নিয়ে স্কোয়াড গঠন করতে হবে। তবে এক জন খেলোয়াড়ের জন্য সর্বোচ্চ কত পয়েন্ট খরচ করা যাবে, তার কোনো সীমা নেই।

নিলাম থেকে প্রতিটি দল ২২ জন ক্রিকেটার কিনবে। নিলাম হচ্ছে আইকন ক্রিকেটারদের বাইরের ক্রিকেটারদের। এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য হলো দলগুলোর মধ্যে খেলোয়াড় সংগ্রহে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং শুধু বেশি অর্থ ব্যয় করে শক্তিশালী দল গড়ার প্রবণতা সীমিত করা।

নিলামে ‘এ’ শ্রেণীর খেলোয়াড়দের ভিত্তি পয়েন্ট রাখা হয়েছে ৪০ লাখ, ‘বি’ শ্রেণির ৩০ লাখ, ‘সি’ শ্রেণির ২০ লাখ, ‘ডি’ শ্রেণির ১০ লাখ ও ‘ই’ শ্রেণির ৫ লাখ। এই নিলামের সঙ্গে ক্রিকেটারদের অর্থপ্রাপ্তির কোনো সম্পর্ক নেই। এখানে শুধু দলগুলো খেলোয়াড় বাছাই করবে। ক্রিকেটাররা পাবেন বিসিবি ঘোষিত অঙ্কের ম্যাচ ফি। চার দিনের ম্যাচের ফি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ৫০ ওভারের ম্যাচের ম্যাচ ফি ১ লাখ টাকা ও টি–টুয়েন্টির ৮০ হাজার টাকা।

নিলামে নাজমুল হোসেনকে ১ কোটি ৫৫ লাখ পয়েন্টে নিয়েছে ফরচুনশামসুল হক

কোচিং ও ব্যবস্থাপনা

ডি-থ্রি ট্রফিতে শুধু খেলোয়াড় নয়, দলগুলোর কোচিং ও সহায়ক কর্মীদের নিয়োগেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রধান কোচদের পাশাপাশি সহকারী কোচ এবং অন্যান্য সাপোর্ট স্টাফ বাছাই প্রক্রিয়া হয়েছে ড্রাফটের মাধ্যমে।

এইচ ব্লুস্টারের প্রধান কোচ সোহেল ইসলাম, একমির রাজিন সালেহ, সিটিজেনস ব্যাংকের মিজানুর রহমান বাবুল, ফরচুনের মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন, সেভেন রিংস সিমেন্টের তালহা জুবায়ের এবং ওয়ালটন কোচ হিসেবে আবদুর রাজ্জাককে নিয়েছে।

চলছে খেলোয়াড় নিলামপ্রথম আলো

কবে কোথায় শুরু হবে টুর্নামেন্ট?

বিসিবির ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডি-থ্রি ট্রফির টি-টুয়েন্টি সংস্করণ শুরু হওয়ার কথা ২০২৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর। উদ্বোধনী পর্বের ভেন্যু হিসেবে বরিশালের জীবনানন্দ দাস ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঢাকাতেও ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে চার দিনের প্রতিযোগিতা এবং মে মাসে ৫০ ওভারের সংস্করণ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

সাফল্য নির্ভর করবে মাঠের বাস্তবায়নে

ডি-থ্রি ট্রফি বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে নতুনত্ব আনবে সন্দেহ নেই। তবে শুধু নতুন নাম, করপোরেট মালিকানা কিংবা বড় তারকাদের অংশগ্রহণ দিয়ে একটি প্রতিযোগিতার সাফল্য নিশ্চিত হয় না।

মানসম্মত উইকেট, পর্যাপ্ত ম্যাচ, খেলোয়াড়দের সময়মতো পারিশ্রমিক পাওয়া, প্রতিযোগিতামূলক দল গঠন এবং দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখা—এসবের ওপরই নির্ভর করবে এই আয়োজনের সাফল্য–ব্যর্থতা।

আরও পড়ুন

শরীফুল–তাসকিন–তানজিদদের নিয়ে নিলামে কাড়াকাড়ি

৩ ঘণ্টা আগে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *